মিনিট পাঁচেক পরপর বাসার দরজা খুলে উঁকিঝুঁকি মারতে অভ্যস্থ না হলেও আজ বেশ আনন্দই হচ্ছিলো দিবার।একটা উত্তেজনা কাজ করছে,ঘটা করে একটা সুযোগ ম...
মিনিট পাঁচেক পরপর বাসার দরজা খুলে উঁকিঝুঁকি মারতে অভ্যস্থ না হলেও আজ বেশ আনন্দই হচ্ছিলো দিবার।একটা উত্তেজনা কাজ করছে,ঘটা করে একটা সুযোগ মিলবে লোকটাকে কব্জা করার। লোকটা সম্ভবত জানেনা সুন্দরী মেয়েরা বেশিদিন কারো অনীহা সহ্য করতে পারেনা।
বেশ কিছুক্ষণ পর আবার দরজা খুললো দিবা।পাশের ফ্লাটের সামনে ভদ্রলোক বিব্রত অবস্থায় দাঁড়িয়ে,কাউকে ডাকতেও পারছেনা, ঢুকতেও পারছেনা দেখে মজা পাচ্ছে দিবা।
_এই যে,আপনাদের বাসার চাবি।
>ওহ হুম,আপনি কে?
_নিশ্চয় একটা মেয়ে?তাইনা? চোঁখ কপালে উঠে গেলো দিবার।
>হ্যাঁ তা দেখতেই পাচ্ছি।
_ আর কিছু প্রয়োজন নেই তবে,আন্টি কোথায় যেনো গেছেন তাই আপনার জন্য চাবি রেখে গেছেন। উনি হয়তো দুদিন থাকবেন সেখানে।
> হু আচ্ছা।
ঠাস করে দরজা টা লাগিয়ে চলে গেলো দিবা।
তালা খুলতে খুলতে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অর্পণ। এই বাসায় যে এত বড় একটা মেয়ে থাকে তা আগে জানতোই না সে।দেখতে বেশ স্মার্ট,ভালোই,শুধু কথা বলার ব্যাকরণ শেখেনি,ভাবতে ভাবতেই অর্পণ তার মা কে কল করলো।
রাত প্রায় ন টা,কলিংবেলের শব্দে দরজা খুলে আরেক দফা অবাক অর্পণ, দিবা প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে।
_সরেন,এগুলা রেখে আসি। আপনার জন্য রাতের খাবার পাঠিয়েছে মা।
>বাহ ভালোই তো,আপনারা কিভাবে জানেন আমি যে রান্না করিনি?
_জ্বি,জানতে হয়,চেহারা দেখলেই আঁচ করতে পারি তো। অনেকটা দাঁত চেপে বললো দিবা।
>বুঝিনি।
_না কিছুনা,হেহে,আপনার মত বুদ্ধির ঢেঁকির তো রান্না করা মানায় না।
>ইয়ে,আম্মু কি আমার ডিটেইলস জানায়া গেছে নাকি।
আচ্ছা,যান রেখে আসুন এগুলো কষ্ট করে।
পুরো ঘরে চোঁখ বুলিয়ে অবাক দিবা,পুরো বাসা চোঁখ জুড়ানো,আন্টি অনেক শৌখিন যে তা আগে থেকেই জানে দিবা।অনেকবার সে এসেছে অর্পনের মায়ের কাছে।কিন্তু জাস্ট কয়েকঘন্টায় তার সদ্য চাকরিতে জয়েন করা ছেলে বাসার ম্যাপ চেঞ্জ করে দিছে।
খাওয়া শেষে অর্পণ বেশ খুশিমনে বলতে লাগলো,আপনি বেশ ভালো মেহমানদারি করতে পারেন কিন্তু।সমস্যা একটাই,ভাষাজ্ঞান কম।
দিবা রাগে কটমট করে চলে এলো।
পরদিন কলিংবেলের আওয়াজ শুনে খাট থেকে লাফ মেরে এসে দরজা খুলতে গেলো,আম্মু এসেছে নিশ্চয়।দরজা খুলেই চিক্কার,আম্মু..
_ওই চুপ,আম্মু না,দিবা আমি,দিবা।
>ওহ,দিবা,আপনি আবার এখানে কি?
_চশমা পরে আসেন,সাথে লুঙীর গিট শক্ত করে আসবেন।
>স্যরি,স্যরি,আসুন।
_খাবার এনেছি,আন্টি তো আজ ও আসবেনা, তাই।বাসার এই অবস্থা কেন?যুদ্ধ করেছেন নাকি?
>না,আসলে এটা ওটা খুঁজতেই..
_বুঝেছি,অর্পণের খাটে পা দুলিয়ে বসে পড়লো দিবা,ফ্যানটা চালু করেন তো।
>জ্বি,বাধ্য ছেলের মতন বিহেভ দেখে হাসি পাচ্ছে দিবার।
_গুড,এবার তাড়াতাড়ি বইগুলো গুছিয়ে ফেলুন তো।
>জ্বি? কি বললেন?
_সপ্তম আসমান থেকে টুপ করে লাফ দিতে বলেছি,শুনেননি? ঘরটা গুছান তাড়াতাড়ি, পরে খাবেন,কুইক।
>বেচারা কিছুই পারেনা,তাও মোটামুটি কিছু করলো।
গুছিয়েছি,এবার প্লিজ আপনি যেতে পারেন।
_ওই,সেটা বলার আপনি কে? আন্টি আমাকে দায়িত্ব দিয়ে গেছে বাসা দেখার।তাহলে বাসাটা কার এখন?
>দখলি সত্বে আপনার।মালিক তো আমরা।
_তাতে কি? আপনাকে দু বেলা খাওয়াচ্ছি,ফ্রিতে তো হোটেল খুলিনি,টুকটাক কাজ তো করে দিতেই পারেন।
>খোটা দিচ্ছেন? আপনি তো দেখছি বউয়ের মত বিহেভ করছেন,আজিব।
_ওমা তাই? কটা বিয়ের অভিজ্ঞতা হইছে শুনি? দেখে ত মনে হয়না কেউ এ জীবনে মেয়ে দিবে,যত্তসব।
>এক্সকিউজ মিহ,
_যান তো,কাপড় গুলো ভিজিয়েছি আমি ওগুলা ধুয়ে ছাদে দিয়ে আসুন।
>আমার আসলে ক্ষিদে পাইছে,বলছিলাম.....
_ অর্পণের মুখটা দেখে দিবা একদম নরম হয়ে গেলো,আচ্ছা আসুন খেতে দিচ্ছি,খেয়ে ওগুলা ধুইবেন। ছাদে যেনো দেখি আপনাকে।
>আচ্ছা।
ছাদে কাপড় দিয়ে নিচে নামতে যাবে এমন সময় দিবার ডাক,
_হ্যালো,কই যাচ্ছেন চোরের মত?
>চোর মানে,আমি আমার বাসায় যাই।
_যান,কাপড়গুলো কি আপনার বউ এসে নিয়ে যাবে?
>বউ কই পাই বলুন তো,পেলে অবশ্য মন্দ না,বউ উপকারী এখন বুঝতেছি।
_আচ্ছা,ভোলাভালা চেহারা যেমন দেখান আসলে আপনি তেমন না,ভেতরে ঠিক ই রঙ ঢং আছে,বাব্বাহ।
>এ কেমন ভাষা,সুন্দর করে বলা যায়না?
_আর সুন্দর,তো বিয়ে করবেন? আন্টিকে বলতাম তাহলে,আমার বাসা থেকেও বিয়ের চাপ দিচ্ছে কিন্তু।
>কিছু বললেন?
_এত কথা বলেন কেন,এখানে দাঁড়াই থাকেন আমার সাথে,কাপড় শুকালে তারপর যাবেন।নয় রাতে ডিনার পাঠাবো না।
>আপনি বড্ড টর্চার করেন সবাইকে,তাইনা।
_সবাই না,আপনাকে শুধু,আন্টি নাই, এই সুযোগে আপনাকে সভ্য বানাচ্ছি।চুপচাপ দাঁড়াই থাকেন।
অর্পণ চাইছে মেয়েটা আর না আসুক,না খেয়ে থাকা ঢের ভালো এর থেকে।
রাতে ডিনার নিয়ে এসে আরেক দফা বকাঝকা করে ঘর মুছিয়ে চলে গেলো দিবা।
যথারীতি পরদিন ও সকালে নাস্তা নিয়ে আসলো দিবা,আধঘণ্টা কলিংবেল বাজিয়ে ঘুম ভাঙাতে হলো অর্পণের।রাগে কটমট করে তাকিয়ে বলল,
_ওই আমাকে কি তোর কেয়ার টেকার লাগে?
আড়মোড়া দিতে দিতে অর্পণ বলল,ছিঃ ছিঃ কেয়ার টেকার হবেন কেন? তারা তো অনেক বাধ্য হয়।
_থাপ্পড় দিয়া মশকরা বের করে দিমু,বদ পোলা কোথাকার।
>আরে আমি কি করলাম ম্যাম?
_এতক্ষণ লাগাইলি কেন দরজা খুলতে,জানতি না আমি আসুম এখন?
>আমি কিভাবে জানবো? আমার হাতে তো আপনার রিমোট নেই,তাহলে অবশ্য সময় সুযোগ মতন নিষ্ক্রিয় করে রাখা যেতো।আপনার তো কিছুই ঠিক নেই।
_ এত্ত ইনসাল্ট! তা জানবি কেন,তোর তো সব খেয়াল শুধু বই এর ভেতর।যত্তসব, চলেই যাচ্ছি।দুপুর থেকে নিজে রান্না করে খাবি,আর যদি আসি দেখিস।
>আরে শুনুন, নাস্তা গুলো তো রেখে যান।
_ওই তোর লজ্জাশরম নাই? নাস্তাও অফ।
বিড়বিড় করতে করতে দিবা ধুম করে দরজা লাগিয়ে দিলো নিজের বাসার।অর্পণ ঠিক কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো ঠিক নেই,এরকম ব্যবহারে সে অভ্যস্থ নয় কিনা।অনেক রাগী মেয়েটা।
একটু পর দিবা দরজা খুলে দেখলো একইভাবে দাঁড়িয়ে অর্পণ।
_ওই এখানে এভাবে দাঁড়াই আছস কেন এখনো,সহ্য হচ্ছেনা, যা ভেতরে তাড়াতাড়ি।
>জ্বি জ্বি করতে করতে দরজা লাগিয়ে দিলো অর্পণ।
দিবা ভ্যাবাচ্যাকা মার্কা অর্পণের মুখটা দেখে একা একা অট্টহাসি দিতে লাগলো।এই ছেলের উপর ওর বহু ক্ষোভ,পাশাপাশি ফ্লাটে থাকে এতবছর,দিনে চারবার চোঁখাচোঁখি হয় অথচ এখন বলছে চিনেই না।
সকাল থেকে অপেক্ষা করছে অর্পণ, হয়তো আবার আসবে দিবা।মেয়েটা রাগ করেছে বড়।অবশ্য দিবার রাগ জায়েজ এক্ষেত্রে,নিজের প্রতিই রাগ হচ্ছে অর্পণের।সকালে তাই নাস্তাও করেনি,দুপুর হয়ে গেলো দিবাও আসেনি।খিদে পাচ্ছে প্রচুর,ফ্রিজ থেকে মাছ বের করে রাঁধতে গেলো সে।ভাত বসিয়ে কাঁচা মরিচ, পিয়াজ কাটছে,হঠাৎ বেল বেজে উঠলো,তড়িঘড়ি করে যেয়ে খুললো। স্বয়ং দিবা দাঁড়িয়ে।
অর্পণের ঘর্মাক্ত মুখ দেখে ঘাবড়ে গেলো দিবা,পাশ কাটিয়ে ভেতরে গিয়ে অবাক দিবা।যা ভেবেছিলো তাই।
_কি করছিলেন এসব?
>আর বলবেন না,রান্নার হাতেখড়ি যাকে বলে,অইযে ইউটিউব দেখে।
_গম্ভীর হয়ে বসলো দিবা,বেশ তো,করুন।
পেয়াজ কাটছে,চোঁখ দিয়ে পানির বন্যা বইছে,দিবা হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছেনা।চোঁখের পানি মুছতে গিয়েই বিকট চিৎকার, মরিচ কাটা হাত লেগেছে।
দিবা প্রায় অপ্রস্তুত হয়ে গেলো,টেনে এনে অর্পণের চোঁখে ওড়না দিয়ে ভাপ দিতে লাগলো।চোঁখ খুলতেই পারছেনা বেচারা।
দিবার খালি কান্না পাচ্ছে।অর্পণকে বসিয়ে দিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বোবার মতো।
অনেক্ষণ পর দিবার কথা বের হলো,
_জ্বলছে খুব?
>একটু এখন,ঠিক হই যাবে।
_কে বলেছিলো রাঁধতে? আমি কি আসতাম না? চালাক হচ্ছেন খুব।
>আসলে,সকালে খাইনি তো,সো আপনিও আসছেন না,তাই আরকি..
এবার দিবা সত্যিই কেঁদে দিলো,রাগ ও হচ্ছে,
_তুই গেলিনা কেন আমাদের বাসায়? তোর কি মগজ নাই একটু? আমাকে সহ্যই হয়না তাইনা।
হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অর্পণ, আলাদা কিছু অনুভূতি তৈরি হচ্ছে এই মুহূর্তে।বকাগুলো সুরের মত লাগছে।
>প্লিজ কাঁদবেন না দিবা,কেউ শুনবে তো।
_তো? শুনুক।বদনাম হবে তাই তো? ঠিক আছে আর আসবোনা,আন্টি আসলেও না।দ্রুত পা চালালো দিবা।
অর্পণ কি মনে করে দৌঁড়ে গেলো পেছন পেছন।আজ বোকামো করলে মেয়েটা ওকে খুন ই করে ফেলবে হয়তো।
পেছন থেকে দিবার হাত টেনে বললো,ইয়ে মানে,রান্না টা করে দিলে ভালো হতো আর কি।
দিবা তাকিয়ে দেখে মুচকি হাসছে অর্পণ, এই হাসির অর্থ বুঝতে ব্যাখ্যা লাগেনা।শব্দ হয়না কোনো কোনো আবির্ভাবের, সম্পর্কের জন্য একটা নাম,একটা নিয়ম,একটা বিশেষ বাক্য আবশ্যক। "ভালোবাসি আপনাকে "
অথচ কিছু হাসি শব্দবিন্যাস ছাড়াই কাউকে আপন করে নেয়ার সমস্ত ব্যাকরণ তৈরি করে,ভালোবাসি নামক শব্দের জন্ম দেয় এই হাসি।
_______Mehtarin A Hiya

COMMENTS