কাঁপতে কাঁপতে ছাদে দৌড় দিলাম।
আম্মাকে ডেকে বললাম, "আম্মা নিচে চলেন"
আম্মাকে কোন কথা বলার সুযোগ দিলাম না, হাত ধরে টেনে নিচে নিয়ে এলাম, আম্মা নিচে এসে কয়েক'টা চিৎকার দিলো, আমি খিকখিক করে হেসে দিলাম, আম্মা আমাকে বললো-
- এত ঠাডা তোর ইনবক্সে পড়ে একটা ঠাডা তোর ওপর পড়তে পারে না?
- একটা ঠাডা সিরিয়ালের ওপর পড়তে পারে না?
- ফাতু তুই বেশি কথা বলিস না...
- আচ্ছা আমি চুপ থাকি, আপনি একাই কথা বলেন...
বলেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে যাচ্ছিলাম, আম্মা আমাকে ডাক দিলো-
- ফাতু রে.. ফাতু আমাকে একা রেখে যাস না, এই পাগলকে দেখলে আমার ভয় লাগে..
আম্মার করুণাময়ী চেহারা দেখে খুব মায়া লাগলো, ওপরে না গিয়ে নিচে নেমে এলাম, দিয়াশলাই জ্বালাতেই পাগলটা "আগুন আগুন আগুন" বলে দৌড়ে পালালো।
পাগলটা কে জানেন?
পাগলটার ভালো নাম 'নূর'।
আমরা যে বাড়িতে ভাড়ায় উঠেছি তার দু'বাসা পর ওই পাগলদের বাসা, শুনেছি ছেলেটা জন্ম থেকে মাথামোটা, ছেলেটার মা যখন মারা যান তখন থেকে সে আরও বেশি মাথামোটা হয়ে পড়ে, ছেলের বাবা এক হাতে তাকে সামলাতে পারেন না। সম্পত্তির কোন অভাব নেই অথচ তার একমাত্র ছেলের এ'অবস্থা।
আমরা আগে ঢাকা থাকতাম।
আব্বার বদলি হওয়াতে আমরা সহপরিবার জয়পুরহাট চলে আসি, এই নতুন জায়গাটা শহরের ভেতর গ্রামের মতো, কিছুটা উন্নত আবার উন্নত না। জায়গাটা শহুরে হলেও পরিবেশ গ্রাম্য যা আমার ভিষন ভালো লাগে। ছাদে উঠলে নূরদের ঘর স্পষ্ট দেখা যায় কারণ মাঝখানের দু'টো বাসা মাটির যা ইট-বালুর বাড়ির চেয়ে নিচু।
নূরের বাবা মানে আকবর চাচা খুব সৌখিন মানুষ, দক্ষিণে মুখ করে উত্তর দিকে বাড়ি করেছেন, সদর দরজার সামনে কিছুটা জায়গা ফাঁকা রেখে মনোরম নার্সারি করেছেন, পূর্বদিকে "মেহগনি,কড়াই,নারকেল ও সুপারি গাছের নার্সারি করেছেন, দক্ষিণে বিভিন্ন ফুল গাছ লাগিয়েছেন, যেমন- সাদা-গোলাপ,লাল-গোলাপ,ডালিয়া, সূর্যমুখী,গন্ধরাজ ইত্যাদি।
বিশেষ করে ফুলের বাগান দেখতে আমি প্রায় ছাদে যেতাম, শেষ বৈকালে আম্মা আমার সঙ্গে ছাদে বসতেন, মেহগনির নার্সারির পেছনে রয়েছে বিশাল বড়ো পুকুর, যেটাকে ছোটখাটো দীঘি বলা যায়, মিষ্টি মৃদু হাওয়া মন ঠান্ডা করে দেয়, প্রথম প্রথম খেয়াল না করলেও অনেকদিন পর খেয়াল করলাম খুবই রোগা শরীরের একজন মানুষ মেহগনি গাছের পেছন থেকে উঁকি দেয়, আমরা তাকালেই সে গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। আমি আর আম্মা আগে খুব হাসতাম কিন্তু একদিনের পর থেকে আমাদের হাসি বেরিয়ে গেল, সেদিন পাশের বাসার এক আন্টি কথায় কথায় বললেন-
- নূর অল্প বয়স থেকে খুব ফাঁকা ছিলো, তের বা চোদ্দ বছর বয়সে খুবই স্মোংক করতো, ওনার মা এসব দেখে মেনে নিতে পারেননি তাই হঠাৎ স্টোং করে মারা গেলেন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে নূর আরও বেশি উন্মাদ হয়ে ওঠে, কোন সুন্দরী মেয়ে দেখলে তার মাথা ঠিক থাকে না।
আন্টি আরও বললেন-
- এক কন্সটেভল এখানে ভাড়ায় এসেছিলেন সহপরিবার মিলে, সহপরিবার বলতে সে আর তার স্ত্রী। নতুন সংসার, বিয়ের হাওয়া পেয়ে নতুন বধূ হয়ে উঠেন আরও আর্কষনীয় সুন্দরি, নূর পাগলা কন্সটেভলের বউয়ের প্রেমে পড়ে যায়, হুটহাট করে যখনতখন বাসায় এসে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতো, লুচুদের মতো হাসতো, মাঝে মাঝে নাকি কন্সটেভলের সামনেই তার স্ত্রী কে বললো "তোমার পছন্দ এত খারাপ বাবু? এটা কোন বর হলো? আমাকে দেখো, আমি কত স্মার্ট, শুধু আমাকে মানাবে তোমার পাশে"
কন্সটেভলের বউ দুঃখ পেয়ে বাসা বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো, বউয়ের দুঃখে কন্সটেভল চাকরী ছেড়ে চলে গেলেন ।
আন্টির পুরো কথা শুনে বুঝলাম লোকটা পাগল হলেও চরিত্রে গন্ডগোল আছে, এলাকা-বাসির নির্দেশনায় আকবর চাচা তার ছেলেকে বেঁধে রাখতেন, সুযোগ পেলে নূর বাহিরে এসে অযথা মানুষের গায়ে হাত তুলতো, মারতে মারতে মানুষের মাথা থেকে রক্ত বের করে বলতো "তোর মেয়ে নেই? দিতে পারিস না আমাকে? সিঙ্গেল জীবন এত ভালো লাগে?"
লও ঠ্যালা!
এসবের জন্য মানুষ তার ওপর খুব বিরক্ত।
আন্টির কাছে মানুষটার জীবনি শুনে একটু সাবধান হলাম, আম্মাও সাবধান হলেন। ছাদের যে পাশে বসলে চাচার ঘর-বাড়ি দেখা যেতো আমি আর আম্মা সে পাশ টিন দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলাম যাদে অসভ্য লোকটা আমাদের দেখতে না পায়, কিন্তু ঘটনা শুরু হতো মাঝ রাতে।
টিনের ওপর প্রচুর ঢিল ছুড়তো, বড়ো বড়ো ইট নিক্ষেপ করতো। ভয়ে রাতে বাথরুমেও যেতে পারতাম না। আব্বাকে সব কিছু বলার পর আব্বা বলেছেন-
- আর কয়েকদিন দেখো, যদি সমস্যার সমাধান না হয় তবে ব্যবস্থা নেবো।
আব্বার কথা শুনে আমি আর আম্মা কয়েকদিনের জন্য মেনে নিলাম, প্রায় দুই দিন দেখি পাগলার কোন আনাগোনা নেই, আমি আর আম্মা খুশি হলাম। মনে মনে ভাবলাম হয়তো চাচা এবার ভালো করে বেঁধে রেখেছেন বা কোথাও বেড়াতে গিয়েছে, এই ভুল ধারণা খুব শীঘ্রই ভেঙ্গে গেলো যখন জানতে পারলাম "রাত হলে গাছ বেয়ে ওপরে উঠে পাগলা ছাদে বসে থাকে"।
আব্বা-আম্মা খুব রাগান্বিত হন।
আকবর চাচার কাছে নালিশ করেন আব্বা-আম্মা, চাচা রাগান্বিত হয়ে মেহেরিন গাছের ডাল ভেঙ্গে ইচ্ছে মতো মারে ওনার ছেলে নূর কে, সে সময় ওখানে আমিও উপস্থিত ছিলাম।
ওতটা কাছ থেকে সেদিন প্রথম তাকে দেখেছিলাম, কেমন যেনো ভয়ানক চাহনি, চোখের নিচে প্রচুর কালি পড়েছে, গলার নিচে ময়লা, খোঁচা খোঁচা চার-পাঁশটা দাড়ি আছে সঙ্গে হলুদিয়া দাঁত।
আব্বা-আম্মার সঙ্গে বাসায় চলে আসলাম।
পরের দিন আব্বা অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলেন।
আম্মা রান্না ঘরে কাজ করছিলেন, দরজায় কেউ নক করলো, নিয়মমাফিক আমি দরজা খুঁলে কাঁপতে শুরু করলাম, এ তো নূর পাগলা!!
আমাকে দেখে চোদ্দপাটি বের করে হেসে দিলো, আমার ডাকে আম্মা দৌড়ে এসে কাঁপতে লাগলেন, আম্মাকে দেখে নূর পাগলা চোখ বড়ো বড়ো করে বলতে থাকে-
- বাপরে বাপ দু'জনই কী সুন্দরী! কাকে রেখে কাকে ধরি! একজন জলপরী আরেকজন গোলাপরাণি।
আম্মা কোন রকম সাহস দেখিয়ে ধাক্কা মেরে দরজা বন্ধ করে দেয়, আব্বা বাড়ি ফেরার পর আম্মা সব বলেন, আব্বা আবারও রাগান্বিত হয়ে যান। আব্বা ওনার বন্ধুর সাহায্যে নতুন জায়গায় বাসা ভাড়া করেন, আমরা সবাই প্রস্তুত আজ চলে যাবো ঠিক তখনি আবার নূর পাগলা আসে।
চাচার মুখে শুনেছি ওনার ছেলে আগুন খুব ভয় পায়, তাই আগুন দেখিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলাম।
জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে আব্বা আমাদের নিয়ে সিএনজিতে উঠলেন, সিএনজি ছেড়ে দিলো, হঠাৎ সবাই পেছনে ফিরে তাকালাম কারণ নূর পাগলা চিৎকার দিচ্ছে আর বলছে "ওরে শালা অফিসার, একটা অন্তত দিয়ে যা, এই সিঙ্গেল জীবন আর কত ভালো লাগে"
আমি মুচকি মুচকি হেসে দিলাম, আস্তে আস্তে আব্বার কাছে বললাম-
- আব্বা আম্মাকে রেখে যাওয়া যায় না? দুই পাগলের মিলবে ভালো..
আব্বা খটখট করে হেসে উঠলেন, আম্মা মুখ ফুলিয়ে বললেন-
- ফাতুরে তোর আব্বা আমাকে একটু ভালোবাসে না রে!
আব্বা পাশ থেকে বলে উঠলেন-
- না! আমি ভালবাসি না, ভালো তো তোমাকে নূর পাগলা বাসে..
আমি চুপ থাকতে পারলাম না, আব্বার মতো আমিও খটখট করে হেসে উঠলাম...
~ নূর পাগলা
~ Fatema Bibi
COMMENTS