অফিসের কাজ করতে করতে অনেকটা বোর হয়ে গেছি। কখন যে দুপুর থেকে বিকেল হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। সায়মার সাজিয়ে দেওয়া টিফিন ক্যারিয়ারটা এক পাশে ...
অফিসের কাজ করতে করতে অনেকটা বোর হয়ে গেছি। কখন যে দুপুর থেকে বিকেল হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। সায়মার সাজিয়ে দেওয়া টিফিন ক্যারিয়ারটা এক পাশে পড়ে রয়েছে। খাবো খাবো করতে করতে অার খাওয়া হয়নি। জরুরী একটা প্রজেক্ট নিয়ে খুব ঝামেলায় অাছি। মাথাটা বেশ গরম হয়ে গেছে। কী করবো ঠিক বুঝতে পারছি না। গুরুত্বপূর্ণ একটা হিসেব মিলাতে পারছি না। এমন সময় মোবাইলটা ভাইব্রেট করছে। অাচমকা স্ক্রিনে দেখলাম সায়মার নাম্বার। রিসিভ করবো কী করবো না ভাবতে ভাবতেই কেটে গেল। দ্বিতীয়বারের মতো অার সে ফোন দিলো না। সায়মা জানে, অামি ব্যস্ত থাকলে ফোনটা তুলি না।
.
পরিবারকে সুখী রাখতে গিয়ে সবকিছুই বিসর্জন দিতে হচ্ছে অামাকে। না চাইলেও অনেককিছুই করতে হচ্ছে। সেজন্য হয়তো পরিবারের সাথে দুপুরে লাঞ্চ করার সময়টুকু পাই না। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো। ফোনটা ব্যাক করলাম,
'হঠাৎ ফোন দিলে যে?'
সায়মা ফোনটা রিসিভ করতেই বলে উঠলাম। সায়মা মনে হয় একটু অপ্রস্তুতই ছিল অামার এ কথায়। বললো,
'তোমায় তো প্রতিদিনই এ সময় ফোন করি। ভুলে গেছ বুঝি?'
'ও সরি সায়মা, সত্যি ভুলে গেছি। অাসলে অাজকে অামি মেন্টালি একটু বেশিই ডিপ্রেশনে অাছি।'
'ও। সেজন্য মনে হয় দুপুরে খাওনি?'
মেয়েটা অামাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। সেজন্য হয়তো অামার সবকিছুই জানতে পারে। অামি কখন কী করছি না করছি, কিংবা এই যে অামার দুপুরে খাওয়া হয়নি সে কথাও।
'খেয়ে নেব। অাসলে প্রজেক্টের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ বুঝতে পারছি না। অামি পরে কথা বলছি।'
'এই শোন।'
'হুম বলো।'
'প্রথম থেকে শুরু করো, দেখবে প্রবলেম সলভ হবে ইনশাআল্লাহ। অার খেয়ে নিও দ্রুত। নাহলে শরীর খারাপ করবে।'
অামার কেটে দেওয়ার প্রয়োজন পড়লো না। সায়মা নিজেই কেটে দিলো। শীতের সময় শেষে অাজ বসন্ত এসেছে, তবুও যেন ঘামছি। ফ্যানটা হালকা করে ছেড়ে দিলাম। টেবিলে বসে সায়মার কথানুযায়ী প্রথম থেকে শুরু করলাম। খুব মনোযোগ সহকারে দেখতে লাগলাম প্রত্যেকটা পয়েন্ট। অালহামদুলিল্লাহ! অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পর সহজেই বিষয়টা বোধগম্য হলো। মনে মনে অাল্লাহর দরবারে শুকরিয়া করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
.
বিকেলের মিষ্টি হাওয়া তখন বইছিল। বিকেলের বাতাসের অন্যন্য একটা স্বাদ অাছে। যেটা সবসময় পাই না। অাজ হঠাৎ পাচ্ছিলাম। চেয়ার থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। অামার অফিসের নিচে জানালা দিয়ে খুব সুন্দর দেখা যায়। অাজ মনে হচ্ছে শহরটা অন্যরকম সাজে সেজেছে। অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারছি না। সায়মাকে ফোন দিলাম, ফোনটা রিসিভ করতেই প্রথম প্রশ্নটা করে বসলাম,
'অাজকে কি কোনো বিশেষ দিন সায়মা?'
সায়মা অবাক হয়ে বললো,
'তুমি বুঝি জানো না?'
'সত্যিই জানি নাহ। বলবে প্লিজ?'
'নাহ! তুমি বের করো।'
'ঢং করো না তো, বলো প্লিজ।'
'অাগে বলো তোমার সমস্যার সমাধান হয়েছে?'
'হুম হয়েছে।'
'দুপুরে খেয়েছ?'
'নাহ। তবে এখনি খাব।'
'অাজকের দিনের স্পেশালিটি কী?'
'পহেলা ফাল্গুন।'
দুটো শব্দ পহেলা ফাল্গুন বলে মিষ্টি হেসে ফোনটা কেটে দিলো সায়মা। দিনটার নাম শুনে বেশ অবাক হলাম অামি। এত গুরুত্বপূর্ণ দিনটা কী করে ভুলে গেলাম! হঠাৎ লক্ষ্য করলাম রাস্তা দিয়ে একটা রিকশা যাচ্ছে। রিকশাটার উপরে দু'জন কপোত-কপোতী। অনেকটা ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দু'জন। বেশ লজ্জা পেলাম অামি। জানালা থেকে সরে অাসতেই শফিক সাহেবের অাগমন। দরজায় এসে বললেন,
'স্যার অাসব?'
অামি চেয়ারে বসতে বসতে বললাম,
'হ্যাঁ শফিক সাহেব, অাসুন।'
একটা এপ্লিকেশন অামার হাতে দিয়ে বললেন,
'অাজ অামার কাজ শেষ। যদি অাজকের মতো অামাকে ছুটি দিতেন তাহলে কৃতজ্ঞ থাকবো অাপনার উপর।'
এপ্লিকেশনটা সাইন করতে করতে বললাম,
'হঠাৎ ছুটির দরকার পড়লো যে শফিক সাহেব?'
অামার এ প্রশ্ন শুনে শফিক সাহেব কিছুটা লজ্জা পেলেন। অামি ব্যাপারটার কিছুটা অাঁচ করতে পেলাম। হেসে বললাম,
'বউকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাবেন নাকি?'
শফিক সাহেব হেসে ফেললো। সাথে অামিও হাসলাম। শেষপর্যন্ত অামার ধারণাই সঠিক হলো।
.
কলিং বেল বাজাচ্ছি। সায়মা দরজা খুলে দিয়ে অামাকে দেখে চকিত হয়ে বললো,
'হঠাৎ এ সময় তুমি?'
অামি দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বললাম,
'কেন, এ সময় অাসতে মানা নাকি?'
'না মানে, গত এক বছর তো তুমি এ সময় ফিরোনি। সেজন্য বলছিলাম।'
অামি পকেট থেকে বেলী ফুলের মালাটা সায়মার খোঁপায় বেঁধে দিতে দিতে বললাম,
'অাজ না পহেলা ফাল্গুন, তুমিই তো বললে। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও শেষ। ভাবলাম বাসায় ফিরে তোমাকে সারপ্রাইজ দেই।'
খোঁপায় বেঁধে দেয়া ফুলগুলো নাড়তে নাড়তে খুব খুশি হলো সায়মা। অফিস থেকে ফেরার পথে তারজন্য কিনেছি। যদিও প্রায় তাকে বেলী ফুলের মালা পরিয়ে দিতাম। এখন কাজের চাপে অার রোমান্টিকতা অাসে না। অামি সায়মার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বললাম,
'রেডি হও। অাজ বাইরে ঘুরতে যাব। রাতের নিস্তব্ধ পরিবেশ কিছুটা উপভোগ করি।'
সায়মা চোখ টিপে বললো,
'এত রোমান্টিকতা অাসছে কোথা থেকে?'
'কেন? অামি অামার বউয়ের সাথে রোমান্টিকতা করতে পারব না?'
বলেই সায়মার কপালে একটা চুমু এঁকে দিলাম। ও খুব লজ্জা পেয়ে দ্রুত বেডরুমের দিকে হাঁটা দিয়ে বললো,
'তুমি বসো। অামি রেডি হয়ে অাসছি।'
সায়মার মুখের হাসিটা দেখে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। কতদিন এ হাসি অামি চাপা দিয়ে রেখেছিলাম। এ হাসির মধ্যেই প্রকৃত সুখ বুঝি মিশে অাছে। নাহলে অামি তার হাসির মোহে বুঁদ হয়ে অাছি কেন?
.
নিস্তব্ধ অাকাশ। চাঁদের অাশেপাশে অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছে। এক জোড়া কপোত-কপোতী একজন অারেকজনের কাঁধে মাথা দিয়ে সুখ খোঁজার সফল চেষ্টা চালাচ্ছে। রাত বাড়তেই থাকে, সেদিকে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।
(সমাপ্ত)
.
ছোটগল্প: এক ফাগুনে
লেখা: সাজ্জাদ অালম বিন সাইফুল ইসলাম
.
পরিবারকে সুখী রাখতে গিয়ে সবকিছুই বিসর্জন দিতে হচ্ছে অামাকে। না চাইলেও অনেককিছুই করতে হচ্ছে। সেজন্য হয়তো পরিবারের সাথে দুপুরে লাঞ্চ করার সময়টুকু পাই না। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো। ফোনটা ব্যাক করলাম,
'হঠাৎ ফোন দিলে যে?'
সায়মা ফোনটা রিসিভ করতেই বলে উঠলাম। সায়মা মনে হয় একটু অপ্রস্তুতই ছিল অামার এ কথায়। বললো,
'তোমায় তো প্রতিদিনই এ সময় ফোন করি। ভুলে গেছ বুঝি?'
'ও সরি সায়মা, সত্যি ভুলে গেছি। অাসলে অাজকে অামি মেন্টালি একটু বেশিই ডিপ্রেশনে অাছি।'
'ও। সেজন্য মনে হয় দুপুরে খাওনি?'
মেয়েটা অামাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। সেজন্য হয়তো অামার সবকিছুই জানতে পারে। অামি কখন কী করছি না করছি, কিংবা এই যে অামার দুপুরে খাওয়া হয়নি সে কথাও।
'খেয়ে নেব। অাসলে প্রজেক্টের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ বুঝতে পারছি না। অামি পরে কথা বলছি।'
'এই শোন।'
'হুম বলো।'
'প্রথম থেকে শুরু করো, দেখবে প্রবলেম সলভ হবে ইনশাআল্লাহ। অার খেয়ে নিও দ্রুত। নাহলে শরীর খারাপ করবে।'
অামার কেটে দেওয়ার প্রয়োজন পড়লো না। সায়মা নিজেই কেটে দিলো। শীতের সময় শেষে অাজ বসন্ত এসেছে, তবুও যেন ঘামছি। ফ্যানটা হালকা করে ছেড়ে দিলাম। টেবিলে বসে সায়মার কথানুযায়ী প্রথম থেকে শুরু করলাম। খুব মনোযোগ সহকারে দেখতে লাগলাম প্রত্যেকটা পয়েন্ট। অালহামদুলিল্লাহ! অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পর সহজেই বিষয়টা বোধগম্য হলো। মনে মনে অাল্লাহর দরবারে শুকরিয়া করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
.
বিকেলের মিষ্টি হাওয়া তখন বইছিল। বিকেলের বাতাসের অন্যন্য একটা স্বাদ অাছে। যেটা সবসময় পাই না। অাজ হঠাৎ পাচ্ছিলাম। চেয়ার থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। অামার অফিসের নিচে জানালা দিয়ে খুব সুন্দর দেখা যায়। অাজ মনে হচ্ছে শহরটা অন্যরকম সাজে সেজেছে। অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারছি না। সায়মাকে ফোন দিলাম, ফোনটা রিসিভ করতেই প্রথম প্রশ্নটা করে বসলাম,
'অাজকে কি কোনো বিশেষ দিন সায়মা?'
সায়মা অবাক হয়ে বললো,
'তুমি বুঝি জানো না?'
'সত্যিই জানি নাহ। বলবে প্লিজ?'
'নাহ! তুমি বের করো।'
'ঢং করো না তো, বলো প্লিজ।'
'অাগে বলো তোমার সমস্যার সমাধান হয়েছে?'
'হুম হয়েছে।'
'দুপুরে খেয়েছ?'
'নাহ। তবে এখনি খাব।'
'অাজকের দিনের স্পেশালিটি কী?'
'পহেলা ফাল্গুন।'
দুটো শব্দ পহেলা ফাল্গুন বলে মিষ্টি হেসে ফোনটা কেটে দিলো সায়মা। দিনটার নাম শুনে বেশ অবাক হলাম অামি। এত গুরুত্বপূর্ণ দিনটা কী করে ভুলে গেলাম! হঠাৎ লক্ষ্য করলাম রাস্তা দিয়ে একটা রিকশা যাচ্ছে। রিকশাটার উপরে দু'জন কপোত-কপোতী। অনেকটা ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দু'জন। বেশ লজ্জা পেলাম অামি। জানালা থেকে সরে অাসতেই শফিক সাহেবের অাগমন। দরজায় এসে বললেন,
'স্যার অাসব?'
অামি চেয়ারে বসতে বসতে বললাম,
'হ্যাঁ শফিক সাহেব, অাসুন।'
একটা এপ্লিকেশন অামার হাতে দিয়ে বললেন,
'অাজ অামার কাজ শেষ। যদি অাজকের মতো অামাকে ছুটি দিতেন তাহলে কৃতজ্ঞ থাকবো অাপনার উপর।'
এপ্লিকেশনটা সাইন করতে করতে বললাম,
'হঠাৎ ছুটির দরকার পড়লো যে শফিক সাহেব?'
অামার এ প্রশ্ন শুনে শফিক সাহেব কিছুটা লজ্জা পেলেন। অামি ব্যাপারটার কিছুটা অাঁচ করতে পেলাম। হেসে বললাম,
'বউকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাবেন নাকি?'
শফিক সাহেব হেসে ফেললো। সাথে অামিও হাসলাম। শেষপর্যন্ত অামার ধারণাই সঠিক হলো।
.
কলিং বেল বাজাচ্ছি। সায়মা দরজা খুলে দিয়ে অামাকে দেখে চকিত হয়ে বললো,
'হঠাৎ এ সময় তুমি?'
অামি দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বললাম,
'কেন, এ সময় অাসতে মানা নাকি?'
'না মানে, গত এক বছর তো তুমি এ সময় ফিরোনি। সেজন্য বলছিলাম।'
অামি পকেট থেকে বেলী ফুলের মালাটা সায়মার খোঁপায় বেঁধে দিতে দিতে বললাম,
'অাজ না পহেলা ফাল্গুন, তুমিই তো বললে। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও শেষ। ভাবলাম বাসায় ফিরে তোমাকে সারপ্রাইজ দেই।'
খোঁপায় বেঁধে দেয়া ফুলগুলো নাড়তে নাড়তে খুব খুশি হলো সায়মা। অফিস থেকে ফেরার পথে তারজন্য কিনেছি। যদিও প্রায় তাকে বেলী ফুলের মালা পরিয়ে দিতাম। এখন কাজের চাপে অার রোমান্টিকতা অাসে না। অামি সায়মার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বললাম,
'রেডি হও। অাজ বাইরে ঘুরতে যাব। রাতের নিস্তব্ধ পরিবেশ কিছুটা উপভোগ করি।'
সায়মা চোখ টিপে বললো,
'এত রোমান্টিকতা অাসছে কোথা থেকে?'
'কেন? অামি অামার বউয়ের সাথে রোমান্টিকতা করতে পারব না?'
বলেই সায়মার কপালে একটা চুমু এঁকে দিলাম। ও খুব লজ্জা পেয়ে দ্রুত বেডরুমের দিকে হাঁটা দিয়ে বললো,
'তুমি বসো। অামি রেডি হয়ে অাসছি।'
সায়মার মুখের হাসিটা দেখে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। কতদিন এ হাসি অামি চাপা দিয়ে রেখেছিলাম। এ হাসির মধ্যেই প্রকৃত সুখ বুঝি মিশে অাছে। নাহলে অামি তার হাসির মোহে বুঁদ হয়ে অাছি কেন?
.
নিস্তব্ধ অাকাশ। চাঁদের অাশেপাশে অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছে। এক জোড়া কপোত-কপোতী একজন অারেকজনের কাঁধে মাথা দিয়ে সুখ খোঁজার সফল চেষ্টা চালাচ্ছে। রাত বাড়তেই থাকে, সেদিকে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।
(সমাপ্ত)
.
ছোটগল্প: এক ফাগুনে
লেখা: সাজ্জাদ অালম বিন সাইফুল ইসলাম

COMMENTS