বিয়ের বিশ বছর পার হয়ে গেছে। তো হঠাৎ ইচ্ছে হলো বানুকে উপহার দিবো। ওর নাম ফুলবানু। উপহার বলতে আকর্ষণীয় কোনো কিছু। এমনিতে ওভাবে কিছু আর আয়...
বিয়ের বিশ বছর পার হয়ে গেছে। তো হঠাৎ ইচ্ছে হলো বানুকে উপহার দিবো। ওর নাম ফুলবানু।
উপহার বলতে আকর্ষণীয় কোনো কিছু। এমনিতে ওভাবে কিছু আর আয়োজন করে দেয়া হয় না। কাজের ব্যস্ততার মাঝে সারাদিন কেটে যায়।
যখন বিয়ে হয়েছিলো তখন আমাদের কিছুই ছিলো না। খড়ের বিছানায় বাসর হয়েছিলো। সকাল থেকে পেটে দানাফোঁটাও পড়েনি। সে দিনগুলোর কথা বলে দীর্ঘশ্বাসের পাল্লা আর ভারি করতে চাই না।
এখন টাকা পয়সার অভাব নেই। বানুর জন্য বিশটা গাড়ি কিনতে দুবার ভাবলাম না! অনেকেই পাগলামো ভাবতে পারে। ভাবতে পারে আড়াইশো টাকা দিয়ে খেলনা গাড়ি কিনেছি। কিন্তু না, বিশ লক্ষ করে একেকটা গাড়ির দাম।
বিশটা গাড়ি উপহার দেয়ার একটা বিশেষ কারণ আছে। ওর আবার রং সমস্যা। শুনতে কেমন লাগছে! মানে কখনোই ঠিক করতে পারে না সে কোন রং এর শাড়ি পড়বে। কোন রং এর আলমারি কিনবে ইত্যাদি।
এসব আমাকেই ঠিক করে দিতে হয়।
সুতরাং একটা গাড়ি কিনে নিলাম আর রং'টা বানুর পছন্দ হলো না! বানুর সে মুখটা আমি দেখতে পারবো না। তাই বিশটে আলাদা রংয়ের গাড়ি কিনলাম। একটা না একটা তো পছন্দ হবেই বানুর।
সে ঐ গাড়িটা চড়েই গ্রামে যাবে। বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে বিকেল কাটাবে। ইচ্ছে হলে আমরা মেলায় ঘুরতে যাব। বয়স পঁয়তাল্লিশ হয়েছে তো কী?
বিরাট বাড়ি।
গেইট দিয়ে একটা একটা করে বিশটে গাড়ি ঢুকলো। চুপিচুপি উপরে উঠলাম। আমার জন্য দরজাটা খুলাই থাকে সবসময়। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না।
ভেবেছিলাম বানু ঘুমিয়ে থাকবে প্রতিদিনের মতো। কিন্তু না আজকে সে জেগে আছে! দোলন চেয়ারে একটা বই নিয়ে বসে আছে। চোখে একদম ঘুম নেই! অবাক হওয়ার অবকাশ তো রয়েই যায়!
“ কী ব্যাপার? আজকে জেগে আছো যে? ”
বানু ঝট করেই বললো।
“ কী উপহার এনেছেন আমার জন্য হ্যাঁ? ”
উপহারের ব্যাপারে বানুর জেনে যাওয়া আর কৌতূহল দেখে আমি কিঞ্চিৎ পুলকিত হলাম!
“ তুমি জানলে কীভাবে যে আমি আজকে উপহার নিয়ে আসবো? ”
চল্লিশ বয়সী মহিলাটা একটু মৃদু হাসলো।
চোখ দিয়ে ইশারা করে বুঝালো কী এনেছি তাড়াতাড়ি দিয়ে দিতে। আমি বললাম।
“ গাড়ি এনেছি, বিশটে গাড়ি! ”
বানু রীতিমত হুমড়ি খেয়ে নিচে গেলো। আমিও ওর উৎফুল্লতা দেখতে নিচে গেলাম। কিন্তু সেকি কাণ্ড! বানু আর কথা বলছে না। মুখটা গোমড়া করে শোবার ঘরে ফিরলো। বুঝলাম না কিছুই! গাড়িগুলো তো ঠিকঠাকই আছে! ঝকঝকে কাঁচ, চারটে করে চাকা!
বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম! বানু হড়হড় করে কাপড় গোছাচ্ছে!
“ কী ব্যাপার? কাপড় গোছাচ্ছ কেনো? ”
“ চলে যাচ্ছি! ”
“ চলে যাচ্ছি মানে? কোথায়? ”
“ জাহান্নামে! ”
আটকাতে পারলামই না! বানু চলেই গেলো! জাহান্নামে না তবে, তাঁর বাপের বাড়ি আমার শ্বশুরবাড়ি। এরকম রাগ করে অনেকবার গেছে সে। কিন্তু প্রতিবারের যাওয়ার কারণ আমি জানি।
কিন্তু এবারের কারণটা আমার মাথাতেই ঢুকলো না!
ছেলে একটা আছে। ইনশাআল্লাহ বারোটা বাজে ঘুম থেকে উঠে। কোনোরকম দাঁত মেজে ক্যাম্পাসে যায়। কখন ফিরে তা বানুই জানে। এই বয়সে এসে সকালে এক কাপ চা দেয়ার জন্য যখন কেউ থাকে না।
তখন ফুলবানু প্রাণীটাকে একটু বেশি মনে পড়ে! এই শূন্যতা ভরাট করতে হবে। নাহলে আবার হৃদপিণ্ডটা নাচানাচি শুরু করে। মৃত্যু খুব কাছে মনে হয়! এক সপ্তাহই সহ্য করতে পারলাম না। বানুকে নিতে চলে আসলাম।
বানুর মা বাবা কেউই বেঁচে নেই। এক ভাই আছে, সে বিয়ে করেছে।
এক কাপ চা দিলো। আমি পান করলাম আর যথারীতি লক্ষ করলাম বানুর রাগ ক্ষোভ এখনো সেদিনের চেয়ে একটুও কমেনি!
“ চা খাওয়া হয়েছে? হলে চলে যান। ”
“ চলে যাব মানে? তোমাকে নিতে এসেছি। চলো আমার সাথে। ”
“ আমাকে লাগবে কেনো আপনার? উনিশটা মেয়ের মধ্য থেকে একজনকে বিয়ে করে ফেললেই তো পারেন! ”
হাত থেকে চায়ের কাপটা ঠাস করে নিচে পড়ে গেলো। ঝংকার শব্দ।
“ উনিশটা মেয়ে মানে? মাথা ঠিক আছে তোমার? ”
“ এখন কিছু বুঝেন না। একেবারে কচি খোকা না? বিশটে গাড়ির মধ্যে একটা আমি রাখবো। বাকি উনিশটা ফেরত দিবেন বলে উনিশটা মেয়েকে বিলিয়ে দিবেন। আমি কী কিছু বুঝি না ভাবছেন? ”
“ আরে ঐ উনিশটা মেয়ে কে? কোথা থেকে আসলো? ”
“ বেশি ভং করবেন না। যে উনিশটা মেয়ের সাথে আপনার ভাব! ”
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সোফায় বসলাম। মাথায় হাত। বয়স চল্লিশ পেরোলে নাকি মেয়েদের মাথায় গণ্ডগোল হওয়া শুরু হয়। আজকে নিজের চোখে দেখলাম! যদিও এটা গণ্ডগোল না ভালবাসা কে জানে?
“ বিশটে গাড়ি ”
~ সিয়াম আহমেদ জয়
উপহার বলতে আকর্ষণীয় কোনো কিছু। এমনিতে ওভাবে কিছু আর আয়োজন করে দেয়া হয় না। কাজের ব্যস্ততার মাঝে সারাদিন কেটে যায়।
যখন বিয়ে হয়েছিলো তখন আমাদের কিছুই ছিলো না। খড়ের বিছানায় বাসর হয়েছিলো। সকাল থেকে পেটে দানাফোঁটাও পড়েনি। সে দিনগুলোর কথা বলে দীর্ঘশ্বাসের পাল্লা আর ভারি করতে চাই না।
এখন টাকা পয়সার অভাব নেই। বানুর জন্য বিশটা গাড়ি কিনতে দুবার ভাবলাম না! অনেকেই পাগলামো ভাবতে পারে। ভাবতে পারে আড়াইশো টাকা দিয়ে খেলনা গাড়ি কিনেছি। কিন্তু না, বিশ লক্ষ করে একেকটা গাড়ির দাম।
বিশটা গাড়ি উপহার দেয়ার একটা বিশেষ কারণ আছে। ওর আবার রং সমস্যা। শুনতে কেমন লাগছে! মানে কখনোই ঠিক করতে পারে না সে কোন রং এর শাড়ি পড়বে। কোন রং এর আলমারি কিনবে ইত্যাদি।
এসব আমাকেই ঠিক করে দিতে হয়।
সুতরাং একটা গাড়ি কিনে নিলাম আর রং'টা বানুর পছন্দ হলো না! বানুর সে মুখটা আমি দেখতে পারবো না। তাই বিশটে আলাদা রংয়ের গাড়ি কিনলাম। একটা না একটা তো পছন্দ হবেই বানুর।
সে ঐ গাড়িটা চড়েই গ্রামে যাবে। বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে বিকেল কাটাবে। ইচ্ছে হলে আমরা মেলায় ঘুরতে যাব। বয়স পঁয়তাল্লিশ হয়েছে তো কী?
বিরাট বাড়ি।
গেইট দিয়ে একটা একটা করে বিশটে গাড়ি ঢুকলো। চুপিচুপি উপরে উঠলাম। আমার জন্য দরজাটা খুলাই থাকে সবসময়। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না।
ভেবেছিলাম বানু ঘুমিয়ে থাকবে প্রতিদিনের মতো। কিন্তু না আজকে সে জেগে আছে! দোলন চেয়ারে একটা বই নিয়ে বসে আছে। চোখে একদম ঘুম নেই! অবাক হওয়ার অবকাশ তো রয়েই যায়!
“ কী ব্যাপার? আজকে জেগে আছো যে? ”
বানু ঝট করেই বললো।
“ কী উপহার এনেছেন আমার জন্য হ্যাঁ? ”
উপহারের ব্যাপারে বানুর জেনে যাওয়া আর কৌতূহল দেখে আমি কিঞ্চিৎ পুলকিত হলাম!
“ তুমি জানলে কীভাবে যে আমি আজকে উপহার নিয়ে আসবো? ”
চল্লিশ বয়সী মহিলাটা একটু মৃদু হাসলো।
চোখ দিয়ে ইশারা করে বুঝালো কী এনেছি তাড়াতাড়ি দিয়ে দিতে। আমি বললাম।
“ গাড়ি এনেছি, বিশটে গাড়ি! ”
বানু রীতিমত হুমড়ি খেয়ে নিচে গেলো। আমিও ওর উৎফুল্লতা দেখতে নিচে গেলাম। কিন্তু সেকি কাণ্ড! বানু আর কথা বলছে না। মুখটা গোমড়া করে শোবার ঘরে ফিরলো। বুঝলাম না কিছুই! গাড়িগুলো তো ঠিকঠাকই আছে! ঝকঝকে কাঁচ, চারটে করে চাকা!
বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম! বানু হড়হড় করে কাপড় গোছাচ্ছে!
“ কী ব্যাপার? কাপড় গোছাচ্ছ কেনো? ”
“ চলে যাচ্ছি! ”
“ চলে যাচ্ছি মানে? কোথায়? ”
“ জাহান্নামে! ”
আটকাতে পারলামই না! বানু চলেই গেলো! জাহান্নামে না তবে, তাঁর বাপের বাড়ি আমার শ্বশুরবাড়ি। এরকম রাগ করে অনেকবার গেছে সে। কিন্তু প্রতিবারের যাওয়ার কারণ আমি জানি।
কিন্তু এবারের কারণটা আমার মাথাতেই ঢুকলো না!
ছেলে একটা আছে। ইনশাআল্লাহ বারোটা বাজে ঘুম থেকে উঠে। কোনোরকম দাঁত মেজে ক্যাম্পাসে যায়। কখন ফিরে তা বানুই জানে। এই বয়সে এসে সকালে এক কাপ চা দেয়ার জন্য যখন কেউ থাকে না।
তখন ফুলবানু প্রাণীটাকে একটু বেশি মনে পড়ে! এই শূন্যতা ভরাট করতে হবে। নাহলে আবার হৃদপিণ্ডটা নাচানাচি শুরু করে। মৃত্যু খুব কাছে মনে হয়! এক সপ্তাহই সহ্য করতে পারলাম না। বানুকে নিতে চলে আসলাম।
বানুর মা বাবা কেউই বেঁচে নেই। এক ভাই আছে, সে বিয়ে করেছে।
এক কাপ চা দিলো। আমি পান করলাম আর যথারীতি লক্ষ করলাম বানুর রাগ ক্ষোভ এখনো সেদিনের চেয়ে একটুও কমেনি!
“ চা খাওয়া হয়েছে? হলে চলে যান। ”
“ চলে যাব মানে? তোমাকে নিতে এসেছি। চলো আমার সাথে। ”
“ আমাকে লাগবে কেনো আপনার? উনিশটা মেয়ের মধ্য থেকে একজনকে বিয়ে করে ফেললেই তো পারেন! ”
হাত থেকে চায়ের কাপটা ঠাস করে নিচে পড়ে গেলো। ঝংকার শব্দ।
“ উনিশটা মেয়ে মানে? মাথা ঠিক আছে তোমার? ”
“ এখন কিছু বুঝেন না। একেবারে কচি খোকা না? বিশটে গাড়ির মধ্যে একটা আমি রাখবো। বাকি উনিশটা ফেরত দিবেন বলে উনিশটা মেয়েকে বিলিয়ে দিবেন। আমি কী কিছু বুঝি না ভাবছেন? ”
“ আরে ঐ উনিশটা মেয়ে কে? কোথা থেকে আসলো? ”
“ বেশি ভং করবেন না। যে উনিশটা মেয়ের সাথে আপনার ভাব! ”
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সোফায় বসলাম। মাথায় হাত। বয়স চল্লিশ পেরোলে নাকি মেয়েদের মাথায় গণ্ডগোল হওয়া শুরু হয়। আজকে নিজের চোখে দেখলাম! যদিও এটা গণ্ডগোল না ভালবাসা কে জানে?
“ বিশটে গাড়ি ”
~ সিয়াম আহমেদ জয়

COMMENTS