পূর্নতা

লেখাঃ Atikul Islam ১ ডাঃ মায়ারানী বিশ্বাসের এসি লাগানো চেম্বারে বসেও কুলকুল করে ঘামছি আমি। আমার কানে এখনো ডাক্তারের শেষ কথাটা বেজে চ...


লেখাঃ Atikul Islam

ডাঃ মায়ারানী বিশ্বাসের এসি লাগানো চেম্বারে বসেও কুলকুল করে ঘামছি আমি। আমার কানে এখনো ডাক্তারের শেষ কথাটা বেজে চলেছে '''আপনার স্ত্রী কখনো মা হতে পারবেন"" ডাক্তার তো কত সহজে কথাটা বলে দিল কিন্তু আমি তো অত সহজে নিতে পারলাম না৷ যদিও তিনি কথাটা বলার আগেই আমাকে মানষিক ভাবে প্রস্তুত হতে বলেছিলেন কিন্তু আমি তো পারি নি পরিপূর্ণ প্রস্তুত হতে। শুধু আমি না, হয়ত কোন স্বামী বা কোন বাবা এই কথা শোনার জন্য কোন ভাবেই প্রস্তুত থাকে না। কপালের বিন্দুবিন্দু ঘাম শার্টের লম্বা হাতা দিয়ে মুছে বললাম
-ম্যাম কোন সমাধান কি নেই..?
আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি উত্তর দিলেন
-আমি আপনাকে মিথ্যে আশ্বাস দেব না তবে বলব শুধু মিরাকলই পারে আপনাদের পরিপূর্ণ করতে..!
আমার আর কিছু বলার নেই, আমি আমার উত্তর পেয়ে গেছি। আমার স্ত্রী যতদিন লিনা থাকবে ততদিন আমি বাবা হতে পারব না। আমি কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না। লিনাকে কি করে বলব
-লিনা তুমি কোনদিন মা হতে পারবে না.!
আর বাড়িতেও বা কি করে বলব এই কথা। যৌথ পরিবার আমাদের। চারভাই আর বাবাকে নিয়ে আমাদের সুখি একটি পরিবার। আমি সবার ছোট। বড় ভাই দের সবার বিয়ে, বাচ্চা হয়ে গেছে। কিন্তু আমার কি হবে..?
ভাইদের বললে তারা কিছু বলবে না হয়ত স্বান্তনা দিবে। আব্বু, তার তো নাতি নাতনি দেখা বা তাদের সাথে খেলা করার সখ মিটে গেছে। বড়ভাইর ৩ মেয়ে, মেঝ ভাইর এক ছেলে এক মেয়ে আর সেজ ভাইর দুই ছেলে। তার হয়ত একটু খারাপ লাগবে কিন্ত ভেঙে পড়বেন না।
মুদ্রার এপিট থাকলে যেমন ওপিঠ থাকে তেমনি যৌথ পরিবারের সুবিধার সাথে নানা সমস্যা আছে। আমার স্ত্রী লিনার সমস্যার কথা যখন বাড়িতে জানাজানি হবে তখন আমাকে ভাইরা কিছু বলবে না। কিন্তু আমি জানি আমার অবর্তমানে কথার বর্শায় আহত হবে আমার স্ত্রী লিনা।
-ভাই একটা গোল্ডলিফ দেন তো..?
একটা চায়ের দোকানে বসে সিগারেট খাওয়া শুরু করলাম। আজ প্রায় ৩ বছর পরে সিগারেট খাচ্ছি। লিনার নিষেধাজ্ঞার কারনে সিগারেট ছেড়েছিলাম ২০১৬ সালে কিন্তু আজ কেন যেন লিনার নিষেধাজ্ঞা মানতে পারলাম না। দুই থেকে তিন টান দেওয়ার পর বুকটা ব্যাথায় ভরে উঠল। ব্যাথাটা দীর্ঘ দিন পর সিগারেট না খাওয়ার জন্য না, ব্যাথাটা এজন্য হল মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই কি লিনার ভালবাসা আমার কাছে ফিকে হয়ে গেল..? এই ভেবে। হাত থেকে সিগারেট ফেলে দিয়ে দোকানদার কে বিল দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। একটা রিকশা নিলাম লক্ষ্য মুচিপোল, রূপগঞ্জ, নড়াইল আর সেখান থেকে আবার তুলারামপুর...!

বাসর ঘরে গুটিসুটি মেরে বসে আছে লিনা। অন্যমনস্ক থাকায় আমি যে রুমে ঢুকে পড়েছি সেটা সে লক্ষ্য করে নি। কিন্তু আমি যখন দরজা লক করলাম তখন সে রকটু নড়ে বসে। দরজা লক করে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি লিনা আমার সামনে দাঁড়িয়ে। কিছু বুঝে উঠার আগেই সে তার মাথা ঝুকিয়ে নিচু হতে শুরু করল। আমার বুঝতে কয়েকমুহুর্ত লেগে গেল সে কি করতে চাচ্ছে ...? যখন বুঝতে পারলাম সে আমার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে ব্যস্ত তখন আমি তড়িঘড়ি করে তার দুই বাহু ধরে আটকিয়ে বললাম
-তোমাকে সারাজীবন বুকে রাখতে চাই, পায়ে না..
আমার কথায় লিনা হয়ত খুব ভরসা খুজে পেল তাই সে কোন কথা না বলেই আমাকে গ্রেফতার করল তার বাহু বন্ধনে। এভাবে লিনা আমাকে মিনিট দুয়েক জড়িয়ে থালার পর আচমকা আমাকে ছেড়ে দিল। ছেড়ে দিয়েই উল্টো দিকে ঘুরে দাড়ালো।
বুঝতে পারলাম সেও তো বঙ্গনারী, লজ্জা তার মজ্জায় মিশে আছে। বঙ্গনারীর সবচেয়ে খারাপ গুন হল ''তার বুক ফাটে কিন্তু মুখ ফোটে না'' জানিনা কথাখানা কোন মনীষী বলেছিলেন তবে আজ লিনা কে দেখে সেই কথার প্রমান পেলাম।
উল্টো দিকে ঘুরে থাকায় তাকে আমি আয়নায় দেখতে পাচ্ছিলাম। কারন আমার রুমের আয়নার সামনেই সে দাঁড়িয়ে। আমি খুব করে তার সেই সলজ্জ মুখখানা দেখছি। ডানহাত দিয়ে বাম হাতের নখ খুচতে ব্যস্ত সে আর তার ঠোঁট জোড়া যেন মুহুর্তের মধ্যে কয়েকশত বার কাপছে। লিনার এই অপ্রস্তুত ভাব দেখে বলি
-লিনা..?
ওপাশে শুধুই নীরবতা তাই আবার বললাম
-লিনা
এবার সে একটু নড়ে উঠল। তার এই হুট করে কেপে ওঠা দেখে আর তাকে একটু স্বাভাবিক করতে বললাম
-সাইলেন্ট মুড থেকে কি ভাইব্রেশনে আসলে দ্বিতীয় ডাকে..?
আমার কথায় সে হেসে ফেলল। কিন্তু হাসিটা মাপা হাসি। শুধু তার মুখেই হাসির এক্সপ্রেশন দেখতে পেলাম.।
দুই মাস পর

-কাব্য..?
-হুম
-তোমার কলেজে অনার্সে কত স্টুডেন্ট..?
-মোট কলেজে..? নাকি শুধু আমাদের বিভাগে..?
-তোমার ইংরেজি বিভাগে..!
-ফার্স্ট ইয়ার থেকে ফাইনাল ইয়ার সব মিলিয়ে ৩২০-৩৪০ জন
-মেয়েদের সংখ্যা কেমন..?
একটু ভেবে বললাম

-ফার্স্ট ইয়ারে মেয়েরা বেশি থাকে কিন্তু শেষ অব্দি সমান সমান হয়ে যায়
-কেন..?
-বাহ রে, তোমার ও তো ফাইনাল ইয়ারে থাকতে বিয়ে হয়েছিল
-তবুও তো তুমি আমাকে পড়াটা শেষ করালে
-আচ্ছা বাদ দাও, তুমি কলেজের কথা কেন শুনলে সেটা বলো..?
লিনা এবার কিছুটা সময় কি যেন মনে মনে ভাবল তারপর বলল
-আচ্ছা তোমার ডিপার্টমেন্ট এ কোন মেয়েটা দেখতে সুন্দরী..?
আমি এতক্ষণে লিনার পাঁতা ফাদ বুঝতে পারলাম কারন আমি যদি এখন কোন মেয়ের কথা বলি তাহলে এখনি কোন রকম ঘোষণা বা আল্টিমেটাম ছাড়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। কারন কোন মেয়েই অন্য মেয়ের প্রসংশা শুনতে পারে না। আর এখানে আমার বউ কত সুন্দর করে গুছিয়ে আমাকে খাদের কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন বিপদ থেকে বাঁচতে বললাম
-আমি একজন শিক্ষক লিনা
-মানে..?
-আমি কোন ছাত্রীর রূপের সৌন্দর্য দেখি না দেখি তার খাতার সৌন্দর্য
লিনা এবার আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। ওর তাকানোর মাঝে অবাক ব্যাপারটা ধরতে পারছি আমি, কিন্তু লিনা কি নিয়ে অবাক হল তা বুঝতে পারছি না। এভাবে প্রায় ৫-৭ সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আমার নাক ধরে বলল
-চালাক হয়ে গেছ তো তুমি...!
-রীনা খানের নাতনির সাথে ঘর করতে হলে এই টুকু তো হতেই হবে...।

বাড়ির সামনে এসে খুব ভয় লাগছে। বাড়িতে ঢুকব কিনা তা নিয়েই নিজের মনের মধ্যে খুব ঝড় চলছে। বুঝতে পারছি না বাড়ি গিয়ে সবাই কে কি বলব। সবাই তো জানে আমি আজ ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম রিপোর্ট আনতে এখন আমি কি বলব বাড়ি ঢুকে। সবার কথা বাদই দিলাম লিনাকে কি বলব..?
একবার ভাবছি বাড়ি গিয়ে বলি আজ ব্যস্ত ছিলাম তাই যাই নি। কিন্তু আবার ভাবছি কথা তো কোন দিন চাপা থাকবে না।
আবার ভাবছি লিনা যদি কখনো অন্যকোন ভাবে জানতে পারে তাহলে মেয়েটা বড্ড বেশি কষ্ট পাবে। তাই ভাবছি কোন কথা না ঘুরিয়ে সবার সামনেই লিনাকে বলে দেই
-লিনা তুমি কখনো মা হতে পারবেনা..!
এই ভেবে রাস্তা থেকে নেমে বাড়ি ঢুকলাম। লিচুতলায় মেজ ভাই আর ভাবি বসে গল্প করছে আমাকে দেখেই ভাবি এগিয়ে এসে বলল
-কি রে কাব্য..? ডাক্তার কি বলল..?
ভাবির কথার কোন জবাব না দিয়ে এগিয়ে এলাম উঠানে বড়ভাই আর আব্বু কথা বলছে আর ভাবি আব্বুর পায়ে মালিশ করে দিচ্ছে। আমাকে দেখে ভাবিও বলল
-ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলি..?
তার কথার ওকোন জবাব দিলাম না। আমি বাড়ি এসেছি এইটা বুঝতে পেরে লিনা আর সেজ ভাবি রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। সেজভাবি এ
সেই একই প্রশ্ন করতে যাবে তার আগেই আমি বাড়ির সবার সামনে লিনার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসলাম আমাদের ঘরে। সবার সামনে কাজটা করা হয়ত ঠিক হয়নি অনেকটা নির্লজ্জের মত হয়ে গেল কাজটা। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। আজও ঘরে দরজা লক করে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি লিনা আমার সামনে। লিনাকে খাটের উপর বসিয়ে একটা টুল টেনে ওর মুখোমুখি বসে বললাম
-লিনা..?
-হুম সাহেব...
সাহেব কথাটা আমার ভেতর টা দুমড়ে মুচড়ে দিল। মেয়েটা যখন ভয় পায় তখন আমাকে সাহেব বলে। আর মেয়েটা শুধু আমার রাগকেই ভয় পায়। এর আগে যতবার রেগেছি ওর সাহেব ডাক শুনে তা ধরে রাখতে পারি নি। আজ আমি রেগে নেই কিন্তু উত্তেজনায় হয়ত আমার মুখের ভাব পাল্টে গেছে। আমি স্থিরভাবে বললাম
-আজ তোমার খুব বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে
-কি এমন সিদ্ধান্ত সাহেব..?
-সেটা পরে বলছি আগে আমার কথা শুনবা তার পর কথা বলবা..!
কোন কথা বলল না। শুধু বাচ্চা মেয়েদের মত ডান দিকে একবার ঘাড় কাত করে জানাল যে সে শুনবে। আমার ভেতর দুমড়ে যাচ্ছে কিন্তু আমি তো আর পারছি না। আমার যে করেই হোক যতটা অমানষিক হয়েই হোক কথা বলতে হবে। আমি লিনার চোখে চোখ রেখে বললাম
-তোমার সাহেব কোনদিন বাবা হতে পারবে না, এখন সিদ্ধান্ত তোমার হাতে। আমি তোমার সব সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার মানষিক প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি
আমার কথা শেষ হলে আমি ওর দিকে তাকালাম। আমি ওর দিকে তাকাতে পারছি না। আমার ওর চোখ দেখার মত সাহস নেই। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে লিনা বলে
-সাহেব...?
আমার বুকে যেন একটা শেল আঘাত করল কিন্তু সেটা নিজের বুকের মধ্যেই রেখে বাইরে শক্ত হয়ে রইলাম। কিন্তু এবার লিনা বাম হাত দিয়ে ডান হাত ধরে আর ডান হাত দিয়ে গাল ধরে হালকা উচু করে ওর চোখ বরাবর রেখে বলল
-সাহেব..?
আমি আর পারলাম না নিজেকে সামলে রাখতে লিনাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেদে ফেললাম। ৩ বছর সংসার করার পর আজ কেম লিনাকে এত আপন মনে হচ্ছে বুঝতে পারলাম না। শুধু এতটুকুই মনে হচ্ছে। লিনা, শুধু আমার লিনা।
কত সময় লিনাকে জড়িয়ে কাঁদলাম বলতে পারব না। একসময় লিনা আমাকে বলল
-স্যার যান এবার হাত মুখ ধুয়ে আসেন
নিজের চোখ মুছতে মুছতে আমি বলি
-একটা কাজ বাকি আছে এখনো..
-কি কাজ স্যার..?
আমি ওর কথার জবাব দিলাম না। আবার ওর হাত ধরে দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। এসে বড়ভাবিকে বললাম
-ভাবি, আমি কোনদিন বাবা হতে পারব না একমাত্র কোন সুপারন্যাচারাল কিছু ছাড়া..!

দুই বছর পর....
সময় পাল্টে গেছে পাল্টে গেছে আমাদের জীবন। লিনা এখন আর সেই তরুণী নেই এখন তার চেহারায় নারীর ছাপ স্পষ্ট। এখন সে তার কিশোরীর চাওয়া নেই এখন তার চাওয়া বলতে আমাকে একটু ভাল রাখা। আমি কিসে ভাল থাকব..? কি করলে আমি খুশি হব..? সে গুলো নিয়েই ওর চিন্তা।
মাঝেমাঝে কুবখুব অবাক হই এই ভেবে, লিনা আমাকে কতটা ভাল বাসে। মেয়েটাকে বলেছিলাম আমি পুরুষত্বহীন একটা পুরুষ, মেয়েটা আমার কথা বিশ্বাস করেছে কিনা জানি না কিন্তু সে আমাকে ছেড়ে যায় নি। আমাকে একা ছেড়ে যাওয়ার জন্য এই একটা কারনই ওর কাছে খুব বড় ইস্যু ছিল। কিন্তু সে যায় নি।
আমি ভাবি আর ওই দিন ওই মিথ্যা বলা হয়ত ভালই হয়েছিল তা না হলে মেয়েটার জীবন নরক হয়ে যেত। হতাসায় কোন ভুল সিদ্ধান্ত ও নিতে পারল। কিন্তু আজ সময় এর সাথে অনেক কিছু পাল্টেছে লেকচারার থেকে আমি সহকারী অধ্যাপক হয়েছি। নড়াইল থেকে আমার ট্রান্সফার সিলেট এমসি কলেজে হয়েছে। কিন্তু পালটায় নি শুধু লিনা। আমার প্রতি ওর ভালবাসা ওর সব অনুভূতি এখনো আগের মতই আছে। এখনো আমি রেগে গেলে আমাকে সাহেব বলে। কোন দাবি পূরণ করতে এখনো স্যার বলে।
সিলেট বিভাগের কোন দর্শনীয় স্থান আমাদের দেখার বাকী নেই এই দুই বছরে। প্রতি মাসেই তিন দিনের একটি সফর করি আমরা। কখনো জাফলং কখনো শ্রী মঙ্গল আবার কখনো সুনামগঞ্জ। এভাবেই চলছে আমাদের জীবন।
-সাহেব কি কিছু করছো..?
এইসব কিছু নিয়ে যখন আমি ভাবছি তখন পেছন থেকে লিনা আমাকে কথাটা বলল। কিছু একটা যে ও বলবে তা আমি বুঝে গেছি তাই বললাম
-না গো রানী..! কিছু বলবা..?
লিনা আমার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির আচলের খুট ধরে আঙ্গুলের নখ খুচ্যে খুচতে বলল
-দুপুর থেকে খুব পেটে ব্যাথা করছে গো
ওর কথা শুনেই মনে পড়ল বেশ কিছুদিন ধরেই ও পেট ব্যাথার কথা বলছে কিন্তু আমি সময়ের অভাবে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যায় নি।
-গ্যাস..?
-না সাহেব..! দুইটা ট্যাবলেট অলরেডি খেয়েছি
এবার একটু চিন্তা করলাম। ওকে সামনে বসিয়ে টেবিল থেকে নিজের মোবাইল নিয়ে শুরু করলাম ফোনবুকে চিরুনী তল্লাশি। হ্যা পেয়েছি। এতসময় ধরে প্রত্যাশার নাম্বার খুজলাম। মেয়েটা আমার হাই স্কুল জীবনের বান্ধবী। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ঢাকা মেডিকেল থেকে গাইনোলজীতে পড়ে এখন পুরো দস্তুর ডাক্তার। শুনেছি এখন সিলেটেই আছে। দুইবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে রিসিভ হল
-ডাঃ প্রত্যাশা সেন বলছিলাম। আপনি কে..?
-ম্যাম আপনার নামে এরেষ্ট ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে..!
আমার কথা শুনেই প্রত্যাশা হেসে দিল। হাসি থামিয়ে কিছুক্ষণ পর বলল
-কাব্য তোর এই কথা পুরনো হয়ে গেছে রে, এতবছর মাস্টারী করেও নতুন কোন ডায়লগ বানাতে পারিস নি।
একটা কথায় আমাকে চিনে ফেলায় বেশ অবাক হলাম। নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বললাম
-কি রে একবারেই চিনলি কি করে..?
-তোর যে গলা..? আর নাইনে থাকতে তোর সে গান আজো আমার কানের পোকা বের করছে তা চিনবো না..?
ওর কথায় আর অবাক হতে পারলাম না। তাই বললাম
-কোথায় আছিস তুই..?
-চেম্বারে রে.
-তোর চেম্বার কোথায়..?
-সোনহানিঘাট, কেন..?
-টিলাগড় থেকে তোর চেম্বারে আসতে কত সময় লাগে রে..?
-এই ধর ২০-৩০ মিনিট
-আচ্ছা
-তুই...
ওর কথা না শুনেই ফোন কেটে দিলাম কারন আমি এই রকমই ছিলাম। ছাত্র জীবনে মনে পড়ে না কোন দিন ওরা আমার সাথে ভালভাবে কথা শেষ করতে পেরেছে তাই আজো ওকে সেই স্মৃতি দিলাম।
৪০ মিনিট পর
আমি প্রত্যাশার চেম্বারের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আসার পথে ওর কয়েকটি ভাটি ফুল এনেছি আর কয়েকটা ফুচকা। ভাটি ফুল নিয়ে একটা ঘটনা আছে। তখন সম্ভবত আমরা টেনে পড়ি আর আমাদের এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাটি পুজা হত সব জায়গায় হয় কিনা জানি না। তো আমার কাছে ও ভাটি ফুল চেয়েছিল কিন্তু আমি ওকে সেবার দিতে পারি নি। তাই ভাবলাম আজ দেনাও শোধ হব আর একটু মজাও করব। চেম্বারে ঢুকেই
-কি রে ডাক্তার কেমন আছিস..?
আমাকে দেখে ওর সামনে যে রোগী আছে সেটাও হয়ত প্রত্যাশা ভুলে গেল। স্বাভাবিক, কারন ইন্টারমিডিয়েট এর পর আজই ওর সাথে দেখা হল। বিস্ময় কাটিয়ে বলল
-তুই..?
-হুম, আমিই আতিকুল ইসলাম কাব্য
-কিভাবে সম্ভব..?
আমি কিছু বলতে যাব তার আগেই লিনা বলে দিল
-সে তো নায়ক..!
প্রত্যাশা লিনাকে দেখে কেমন যেন হল। কারন লিনাকে ও চেনে না। আমাদের বিয়েতে ও ছিল না কারন তখন ও ইন্টার্নিতে ছিল। প্রত্যাশা নিলাকে ইশারা করে বলে
-কে..?
-আপনার ফ্রেন্ড এর কাজের বুয়া..!
-মানে..? তুই বিয়ে ও করেছিস..? ভগবান কত সারপ্রাইজ দিবা আর..?
প্রত্যাশার কথা শুনে লিনা বলল
-কেন আপু..?
-আরে তুমি তো জানোই না, মোট জীবনে প্রেম করতে ব্যর্থ হয়ে কাব্য তো পণ করেছিল বিয়েই করবে না
এবার আমি বললাম
-আমি করতেও চাই নি রে কিন্তু ভাই তো ছাড়ল না
আমার কথা শুনে ওদের দুজনের তো হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার উপক্রম।
যাইহোক সব রোগী ছেড়ে দিয়ে প্রত্যাশা লিনাকে চেক করে দুটো টেস্ট করতে দিল। টেস্টের রেজাল্ট আসতে ঘন্টা দুয়েক দেরি হবে তাই লিমাকে পাঠিয়ে দিলাম বাসায়। যাওয়ার সময় লিনা প্রত্যাশাকে রাতের খাবারের জন্য অনুরোধ করে গেছে উইথ ফ্যামিলি আর প্রত্যাশা ও কথা দিয়েছে যাবে বলে।
দুই ঘন্টা পর
টেস্ট রিপোর্ট প্রত্যাশা খুব মনোযোগ দিয়েই দেখছে। মেয়েটার এই অভ্যাসটা তাহলে এখনো আছে। প্রত্যাশা যখন খবরের কাগজ পড়ত তখন আমরা ওকে রাগাতে বলতাম
-কিরে তোর প্রেমিকের পত্র নাকি..?
যাক মেয়েটার এখনো সেই ধৈর্য আছে। মিনিট খানেক পর বলল
-তেমন কোন সমস্যা না দোস্ত..
-কি হয়েছে..?
-এপেন্ডিক্স..

আট মাস পর,
ওটির বাইরে দাঁড়িয়ে অস্থির হাটাহাটি করছি আমি। শরীর দিয়ে ঘাম বেরিয়ে শার্ট ভিজে যাচ্ছে। ফ্যানের নিচে বসেও কাজ হচ্ছে না। আজ ডাঃ মায়ারানীর চেম্বারের সেই দিনের কথা মনে পড়ছে সেদিন ও আমি এমন করেই ঘামছিলাম।
লিনাকে ওটিতে নিয়ে গেছে প্রায় ৪০ মিনিট হতে চলল। কোন কিছু ভাল লাগছে না৷ বারবার মনে হচ্ছে ভাগ্য নিয়ে এতবড় জুয়া খেলা হয়ত ঠিক হল না। আমার দব চিন্তা ভাসিয়ে দিয়ে প্রত্যাশা হাসি মুখে ওটি থেকে বেরিয়ে এসে বলল
-দোস্ত..!
চেয়ার থেকে উঠে প্রায় দৌড়ে গিয়ে বললাম
-কি..?
-মিষ্টি না খাওয়ালে কিচ্ছু বছি না আজ..!
-খাওয়াব কিন্তু আগে বল..
-বেসম্ভব.! তোরে খুব করে চিনি, আগে মিষ্টিমুখ তারপর কথা
অগত্যা প্রত্যাশার পিয়ন কে পাঠিয়ে দিলাম মিষ্টি আনতে। আমি যখন পিয়ন কে টাকা দিলাম তখন একটা নার্স ওটি থেকে বেরিয়ে এল তার কোলে সাদা তোয়ালেতে মোড়া একটা বাচ্চা। সে এসে আমার কোলে যখন বাচ্চাটা দিল তখন আমার উত্তেজনা বিষ্ফোরিত হয়ে আমার চোখ দিয়ে দুফোঁটা অশ্রু হয়ে বেরিয়ে এলো। অশ্রুসিক্ত চোখে বড়ভাবির দিকে তাকিয়ে বললাম
-ভাবি..! মেয়েটা আমার মতই হয়েছে তাই না..?
ভাবি চোখের পানি আচল দিয়ে মুছে আমার মেয়ের মুখে চুমু খেয়ে বলল
-হ্যা রে, অবিকল তোর মত..!
মেয়েটাকে ভাবির কোলে দিয়ে আমি যখন চুপচাপ বসে আছি তখন আমার মনে পড়ল প্রত্যাশার চেম্বারের সেই কথা..
এপেন্ডিক্সের কথা শুনে আমি প্রত্যাশা কে সব খুলে বলি। আমার অপ্রাপ্তি আর লিনার একাকিত্বের কথা। আমার সব কথআ শুনে কেদেছিল সেদিন প্রত্যাশা। আমার কথায় প্রত্যাশা লিনাকে ছয় মাসের জন্য মেয়েলি সমস্যাটা বন্ধ করতে একটা ইঞ্জেকশন দিয়েছিল। ইঞ্জেকশন দিয়ে প্রত্যাশা আমাকে বলেছিল
-দোস্ত ভাগ্য তোর সাথে থাকবে তো..?
...............
কাল সন্ধ্যায় যখন প্রত্যাশা আমাকে কল দেয় তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম স্ক্রিনে ওর নামার দেখে। একবার মিসড কল হওয়ার পর ছাদে গিয়ে ওকে ফোন দেওয়ার সাথে সাথে রিসিভ করে বলে
-দোস্ত কোথায় তুই..?
ওর কন্ঠে উত্তেজনা স্পষ্ট ছিল তাই জিজ্ঞেস করেছিলাম
-বাসায়, কেন কি হয়েছে..?
-একটা মেয়ে বাচ্চা ডেলিভারিতে মারা গেছে আর মেয়েটা ডেলিভারির আগে ওর বাচ্চাকে কোন আশ্রমে দিয়ে দিতে বলেছে
-কেন..?
-অবিবাহিতা ছিল মেয়েটা..
-তো...?
কথাটা আমার গলায় আটকে গেল। আমার মনে পড়ে সেই দিনের কথাটা। আমি তখন তড়িঘড়ি করে ওর কাছে জিজ্ঞেস করি
-এপেন্ডিক্সের ব্যাথা বাড়ানোর ট্যাবলেটের নাম কি..?
ওর কাছ থেকে নাম শুনে ডিসপেনসারি থেকে সেটা কিনে খুব কৌশলে খাইয়ে দিয়েছিলাম লিনাকে। খাওয়ানোর পর থেকে ব্যাথা শুরু হওয়া অব্দি খুব আতঙ্কে ছিলাম আর তখন থেকে আমি নার্ভাস। ব্যাথা শুরু হলেই আমি লিনাকে নিয়ে চলে আসি প্রত্যাশার কাছে। তারপর প্লান মাফিক প্রত্যাশা বলে লিনা প্রেগন্যান্ট আর বাচ্চার কন্ডিশন ভাল না ইমিডিয়েট সিজার করতে হবে।
কথা গুলো লিনার কাছে স্বপ্নের মত লেগেছিল বোধহয় কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করতে পারে নি। তড়িঘড়ি করে অপারেশন এর ব্যবস্থা করে ওটিতে নিয়ে যাওয়ার সময় আমি যখন লিনার হাত ধরেছিলাম তখন সে বলেছিল
-সাহেব..?
-বেগম..!
-আমরা কোন স্বপ্নে নেই তো..?
-না গো পাখি.. আল্লাহ আছেন না..?
-আমার কিছু হবে না তো..?
-চুপ..! আমার মেয়েকে মানুষ করবে কে তাহলে..?
তারপর ওটিতে নিয়ে যায় লিনাকে। লিনার এপেন্ডিক্সের অপারেশন টা সবার কাছে এখন সিজার হয়ে গেল। আর এই জন্য সব কৃতজ্ঞতা আমি প্রত্যাশা কে দেব..
-স্যার ম্যাম আপনাকে ডাকছে..?
প্রত্যাশার পিয়নের ডাকে কল্পনা থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। তার পর বললাম
-আসছি, তুমি যাও
প্রত্যাশার কেবিনে ডুকেই ওর হাত ধরে হাউমাউ করে কান্না করে দেই আমি। খুব ভাল লাগছে আমার আজ কাদতে। কান্না শেষ হলে প্রত্যাশা বলে
-ট্রান্সফার হবি কবে..?
-আগামী মাসের ২৮ তারিখ
-এখান থেকে অনেক দূরে চলে যা দোস্ত
-থ্যাংকস রে..!
-এত সৌজন্যবোধ তোর কবে থেকে হল..?
হেসে দিলাম ওর কথায়। আমরা যখন হাসছি তখন একজন নার্স এসে বলল
-ম্যাম, লিনা ম্যামের জ্ঞান ফিরেছে..!
......
আমার লিনা শুয়ে আছে তার বেডে আর তার পাশে শুয়ে আছে আমার পরীটা। যাকে আমি চুরি করে এনেছি বেহেশত থেকে। লিনা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। হয়ত এতদিনের অপ্রাপ্তি আজ ও ঘুচিয়ে ফেলিতে চাইছে একবারে। এতদিনের সব দুঃখ আজ পুড়িয়ে ফেলতে চাইছে পরীকে জড়িয়ে। আমার উপস্তিতি পেয়ে চোখ খুলল লিনা আর তখন একটা কথাই ও বলল
-স্যার কোথায় পেলে আমার পূর্ণতার ধন কে...?
আমি ওর কথার জবাব দিলাম না। দেব কি করে আমার কানে একটা গানই বাজছে
"" যখন সময় থমকে দাঁড়ায়,
নিরাশার পাখি দুহাত বাড়ায়,
খুজে নিয়ে মন,
নির্জন কোন,
কি আর করে তখন..?
স্বপ্ন স্বপ্ন স্বপ্ন, স্বপ্ন দেখে মন""

COMMENTS

Name

ltr
item
LOVE STORY: পূর্নতা
পূর্নতা
LOVE STORY
https://bd4lovestory.blogspot.com/2019/02/atikul-islam.html
https://bd4lovestory.blogspot.com/
https://bd4lovestory.blogspot.com/
https://bd4lovestory.blogspot.com/2019/02/atikul-islam.html
true
2929003080188031946
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy